খাচার পাখী

 


​অয়ন অনেকদিন ধরেই একটি থ্রিলার উপন্যাস লেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিদিন ল্যাপটপের সামনে বসলেই তার মনে হয়—"না, লেখাটা মনে হয় ভালো হচ্ছে না। লোকে হাসাহাসি করবে।" এই ভয়ে সে একটা লাইনও শেষ করতে পারে না। তার ভেতরের লেখক সত্তাটা যেন এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দী।

​একদিন বিকেলে অয়ন পার্কের এক কোণে বসে ডায়েরি হাতে ভাবছিল। এমন সময় তার পাশে এসে বসলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের হাতে ছিল একটি কাঠের খাঁচা, আর তার ভেতরে একটা ছোট্ট চড়ুই পাখি।

​অয়ন কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, পাখিটাকে খাঁচায় আটকে রেখেছেন কেন? ছেড়ে দিন না, আকাশে উড়ুক।"

​বৃদ্ধ হাসলেন। তিনি খাঁচার দরজাটা খুলে দিলেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড! পাখিটা খাঁচার বাইরে বেরোনোর কোনো চেষ্টাই করল না। সে ভেতরেই এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে রইল।

​অয়ন বলল, "একী! দরজা খোলা পেয়েও ও উড়ছে না কেন?"

​বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, "কারণ ও অনেকদিন ধরে এই খাঁচাটায় আছে। খাঁচার দরজাটা এখন খোলা, কিন্তু ওর মনের ভেতরের খাঁচাটা এখনো বন্ধ। ও ধরে নিয়েছে ও উড়তে পারবে না। ডানা ঝাপটানোর ভয়টাই ওকে আটকে রেখেছে।"

​বৃদ্ধের কথাটি তীরের মতো এসে লাগল অয়নের বুকে। সে চমকে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে নিজেও তো এই পাখিটার মতোই! সমাজের ভয়, নিখুঁত না হওয়ার ভয়, আর ব্যর্থতার ভয় তাকে একটা অদৃশ্য খাঁচায় বন্দী করে রেখেছে। লেখার প্ল্যাটফর্ম, ল্যাপটপ, ডায়েরি—সব তো খোলাই আছে, শুধু সে নিজেই নিজের মনের দরজাটা বন্ধ করে রেখেছে।

​অয়ন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানিয়ে সে দ্রুত বাসায় ফিরে এলো। ল্যাপটপটা খুলে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। এবার আর কোনো দ্বিধা নয়, ভুল হোক বা ঠিক, সে কিবোর্ডে আঙুল চালাল।

​পর্দার বুকে ভেসে উঠল প্রথম বাক্য—"সেদিন আকাশটা মেঘলা ছিল..."

​একই সাথে অয়নের মনের খাঁচার পাখিটাও যেন ডানা মেলে মুক্ত আকাশে উড়ে গেল।

Discussions & Feedback

No comments:

Post a Comment